বাংলাদেশ চারুশিল্পী পরিষদে আপনাকে স্বাগতম। আপনি যদি বাংলাদেশ চারুশিল্পী পরিষদের সদস্য হতে চান তাহলে join Us Button এ Click করে আপনার তথ্য দিয়ে আমাদের সাথে Join হন |

ক্যালিগ্রাফি’র প্রতিবিম্ব

শিল্প হলো সংস্কৃতির বাহন। সংস্কৃতি আদর্শ ও বিশ্বাসকে ধারণ করে এগিয়ে যায়। আদর্শের মৌলিকত্ব হলো রিলিজিয়ন বা ধর্ম। অহিভিত্তিক ধর্মের সংস্কৃতি এবং অনুমান ও বিশ্বাসের সমন্বিত ধর্মের সংস্কৃতির ধারা ভিন্ন। পথও সম্পূর্ণ বিপরীত। ধর্মই সংস্কৃতি ও শিল্পবোধকে নিয়ন্ত্রণ করে। সভ্যতার গতিপথকে পাল্টে দেয়। যদিও একটি সভ্যতা একই সাথে অনেক রাষ্ট্র, বিভিন্ন ধর্ম এবং বিশ্বাসকে লালন করে।

উপরোল্লেখিত বিষয়গুলো হৃদয়াঙ্গম করার জন্য আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট নিয়ে এক্সাম্পল দিলে বুঝতে সুবিধা হয়; পৃথিবীর সকল ভাষার, সকল বর্ণের, সকল ধর্মের এবং বিভিন্ন পথ ও মতের মানুষের মিলন মেলা হলো অলিম্পিক গেমস অথবা বিশ্বকাপ ফুটবল। বিগতো কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে ভোগবাদী পশ্চিমা সভ্যতা ও ইন্দ্রিয়-ইজম নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। কারণ কাতার একটি মুসলিম রাষ্ট্র! ইসলামী রাষ্ট্র না হয়েও কাতার তার ইসলামী সংস্কৃতি, তাহজিব- তামাদ্দুনের বাগডোর দিয়ে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা ও ইন্দ্রিয়-ইজমের দৌরাত্ব্যকে রুখে দিয়েছে। আপনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখবেন কাতার তার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ভাস্কর্য বিশেষ করে ফাইভ স্টার হোটেল গুলোর ইন্টেরিওর ডিজাইনের ভেতর ক্যালিগ্রাফিকে বিভিন্ন শিল্পরীতিতে অত্যন্ত চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছে। কাতার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাপনী অনুষ্ঠানের সফল এবং নজিরবিহীন প্রেজেন্টেশন দেখে পৃথিবীর মানুষ স্তম্ভিত, বিমোহিতো! বলযায় ইসলামী সভ্যতার সৌন্দর্য দেখে তাঁরা শকড্ এবং আশ্চর্যান্বিত। নৈতিকতা বা ম্যুরালিটির ভেতর থেকে আনন্দ-বিনোদনের ষোলকলা পূর্ণ করে জীবনকে যে উপভোগ করা যায়, দুনিয়ার মানুষ তা নতুন ভাবে উপলব্ধি করে।

ভোগবাদী সভ্যতার দেশ সমূহ ফ্রিমিক্সিংকে শুধু সমর্থন নয় বরং প্রমোট এবং লালন করে। পশ্চিমা দুনিয়ার এমনও পার্ক রয়েছে, যেখানে কাপড় খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে প্রবেশ করতে হয়। তাঁদের সমুদ্র সৈকতে বিকিনি পরে সমুদ্র বিলাস করা স্বাভাবিক ব্যাপার। অথচ প্রচন্ড তাপদাহে আরব বিশ্বের সমুদ্র সৈকতের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো! বিকিনি পরে থাকাতো দূরের ব্যাপার বরং উন্মুক্ত বেহায়াপনার কিঞ্চিতও সুযোগ নেই। এটাই ইসলামী সভ্যতা আর ভোগবাদী সভ্যতার ফারাক।
তবে অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো ফ্রিমিক্সিং এর দেশ হয়েও আমেরিকা ইউরোপের রাষ্ট্র প্রধানরা যৌনকেলেঙ্কারি কারণে ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হতে হয়। তাঁদের সাধারণ জনগণ বেহায়াপনায় গা ভাসিয়ে দিলেও নিজেদের নেতৃত্বের স্খলন মেনে নিতে পারে না। হৃদয়ের গহীনে লুকায়িত ঐশ্বরিক নৈতিকতাবোধ বা ম্যুরালিটি তাঁদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ইন্দ্রিয়-ইজমে বুঁদ হয়ে থাকা ব্যক্তিটিও প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রনেতা এবং তাঁদের ফলোয়াররা পশ্চিমা দুনিয়ার এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নীরবে নিভৃতে অনুসরণ করে চলেন। মুসলিম নামধারী এই সব নেতৃত্বের কারণে ভোগবাদী সভ্যতার পৃষ্ঠপোষকতা এখন সর্বত্র। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিল্প-সাহিত্যে, বিজ্ঞাপনে, নাটক-চলচিত্রে সব জায়গায় বেহায়াপনা ও কাপড় খোলার প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ম্যুরাল বা ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন! এমনকি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ- আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশেও অর্ধ উলঙ্গ নারী মূর্তির ভাস্কর্য ! যা জুলাই বিপ্লবে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ভেঙ্গে ফেলে। অতি আধুনিকতার অন্তরালে মুসলিম দেশ সমূহে ইসলামী তাহজিব-তামাদ্দুন, শিল্প ও সংস্কৃতিকে শুধু সংকুচিত নয় বরং ভোগবাদী দর্শনকে রিপ্লেস করা হচ্ছে।
বলতে দ্বিধা নেই যে, দুনিয়া কাঁপানো ভিন্ন ধারার কাতার বিশ্বকাপ পৃথিবীবাসীকে ঐশ্বরিক কৃষ্টি-কালচার, শিল্প ও সংস্কৃতির দিকে ধাবিতো হতে ইমপ্রেস করে। অতএব, শিল্পচর্চা এবং সংস্কৃতির নামে এই সব অপসংস্কৃতির বলয় থেকে এখনই আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ এন্ড অফ দ্যা ডে তথা শেষ বেলায় মুসলিম-অমুসলিম, আস্তিক-নাস্তিক, ডানপন্থী- বামপন্থী সকলকেই পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিতে হয়। বিশেষ করে মুসলমানের ঘরে জন্ম নেয়া স্বঘোষিত কোনো নাস্তিক বা বামপন্থীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার তাঁরই শবদেহ নিয়ে উপস্থিত হয় জানাযার নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে। ব্যবহারিক জীবন তথা প্রেকট্রিকাল লাইফে যে ব্যক্তি ইসলামী অনুশাসনের বিপরীত চলাফেরা করেছে, তার শেষ বিদায় কেন ইসলামী তরিকায়, মুসলিম রীতিতে হবে?
প্রকৃত সত্য হলোঃ তখন তাঁর পরিবার ও স্বজনদের হৃদয়ের গহীনে লুকায়িত ঐশ্বরিক নৈতিকতাবোধ বা ম্যুরালিটি জেগে ওঠে এবং দিন কয়েক ভোগবাদী দর্শন কেন্দ্রিক লাইফ স্টাইলের জীবনযাপন থেকে বিরত থাকে। ফলশ্রুতিতে কিছুদিনের জন্য হলেও মৃত ব্যক্তির শুবার ঘর, ড্রয়িং রুম সহ সম্ভাব্য সকল জায়গা থেকে ইসলামী কৃষ্টি-কালচার ও শিল্পরীতির বিপরীত সকল পেইন্টিং-ভাস্কর্য ঢেকে দেয়া হয়। অতঃপর দৃষ্টিভঙ্গির মন্দচক্রের আবর্তে তাঁরা আবারও তাঁদের পূর্ব স্বভাবে ফিরে যায়।

আমাদের আদি পিতা-মাতা হযরত আদম ও হাওয়া আলাইহিস সাল্লাম জান্নাতেই ছিলেন। শয়তানের প্ররোচনায় তাঁরা নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করেন, যার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ উভয়ের শরীর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জান্নাতের লেবাস খুলে পড়ে। ফলে তাঁদের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত হয়ে যায়। যদিও তাৎক্ষণিক তাঁরা তাঁদের লজ্জাস্থান জান্নাতি গাছের লতা-পাতা দিয়ে ঢেকে নেন, অনুতপ্ত হন।
মূলতঃ শয়তানের কৌশলগত প্রধান টার্গেট হয়, প্রথমে মানুষের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত করা এবং অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়া। আধুনিক পৃথিবীতে শয়তানের এই অপকৌশল রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে শিল্প-সংস্কৃতির উপর সওয়ার হয়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। আদম সন্তানের ফিতরত হলো জান্নাতি লতা-পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢেকে রাখা। এটাই স্রষ্টা প্রদত্ত্ব নৈতিকতাবোধ বা ম্যুরালিটি। অর্থাৎ আস্তিক-নাস্তিক, মুসলমান কিংবা অমুসলমান প্রতিটি মানুষই ঐশ্বরিক ভাবে প্রাপ্ত এই নৈতিকতাবোধ বা ম্যুরালিটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা, শিল্প-সংস্কৃতি; হয় এই নৈতিকতা বা ম্যুরালিটি লালন করে অথবা দমন করে। মহাপ্রলয় অবধি এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।

ওহীভিত্তিক রিলিজিয়ন তথা ইসলামী তাহজিব-তামাদ্দুন, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাকারী রাষ্ট্রসমূহের মানুষের জীবনধারা, পারিবারিক বন্ধন সর্বক্ষেত্রে দেখবেন একটি প্রশান্তি ও পবিত্রতার ছোঁয়া বিদ্যমান। তার জ্বলন্ত উদাহরণ আরব রাষ্ট্রসমূহ। বিপরীতে ভোগবাদী সভ্যতার জৌলুষপূর্ণ জীবনাচরণে চাকচিক্য থাকলেও কোন প্রশান্তি খুঁজে পাবেন না। যেটুকু স্বস্তি বা পারিবারিক বন্ধন দৃষ্টিগোচর হয় তা কেবলমাত্র রিলিজিয়ন তথা ধর্ম বিশ্বাসের কারণে। অতএব, একটি বাসযোগ্য পৃথিবী এবং শান্তিময় সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য মানুষকে তার অরিজিনে ফিরে যেতে হবে। এক্ষেত্রে পরিমার্জিত সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম।

সৃষ্টিগতভাবে আদম সন্তানের ডেস্টিনেশন হলো জান্নাত। জান্নাতের ভাষা হলো আরবী। আরবী বর্ণমালা দিয়েই মহান আল্লাহ তা’য়ালা লাওহে মাহফুজে’র ফলকে পবিত্র কুরআনকে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। আর ক্যালিগ্রাফির মৌলিক উৎস হলো আরবি। সুতরাং আরবী ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে দ্যা আর্ট অফ হ্যাভেন বা স্বর্গীয় শিল্প। এ কারণেই ক্যালিগ্রাফি দর্শনে আধ্যাত্মিক ভাব ও পবিত্রানুভূতি তৈরি হয়।
ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে লিপিকলার সর্বোচ্চ চূড়া। চারুলিপি বা হস্তলিপি হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম এর পুত্র হযরত শীস আঃ এর হাত ধরে পৃথিবীতে যাত্রা শুরু করে। সে বর্ণমালা ছিলো আরবী। পর্যায়ক্রমে কালের বিবর্তনে বিভিন্ন বর্ণ এং ভাষা মহান আল্লাহ তা’য়ালাই পৃথিবীতে সৃষ্টি করেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমান সমূহ ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (৩০ সূরা রুমঃ২২)

আসমানী কিতাব সমূহের মধ্যে তাওরাত ও যাবুর কিতাব হিব্রু ভাষায় নাযিল হয়েছে। হযরত ঈসা আঃ এর উপর ইঞ্জিল কিতাব সুরিয়ানি বাসায় অবতীর্ণ হয়। সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুরআন আরবি ভাষায় নাযিল হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর উপর কুরআনে কারীম অবতরণের পূর্বেও পৃথিবীতে লিপিকলার প্রচলন ছিলো। আরবের বিখ্যাত ‘ওকাজ মেলা’কে কেন্দ্র করে পবিত্র কা’বার দেয়ালে হাতে লেখা কবিতা টানানো হতো। এসবই লিপিকলার অংশ।
মূলতঃ লিপিকলার হাত ধরেই ক্যালিগ্রাফির যাত্রা। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর সিল মোহর তৈরীর মাধ্যমেই ক্যালিগ্রাফির শুভ সূচনা। রাসূলে করীম সাঃ হযরত আলী (রাঃ) কে তাঁর জন্য একটা সিল মোহর তৈরি করে দিতে বলেন। নির্দেশ পেয়ে হযরত আলী (রাঃ) তিন লাইন বিশিষ্ট গোলাকৃতির একটি সীলমোহ তৈরি করেন; যার কম্পোজিশন ছিলো উপরে ‘মোহাম্মদ’ মধ্যখানে ‘রাসূল’ এবং নিচে ‘আল্লাহ’। উক্ত কম্পজিশনটি হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর পছন্দ হলো না, বরং তিনি উপরে ‘আল্লাহ’ মধ্যখানে ‘রাসূল’ এবং নিচে ‘মুহাম্মদ’ লিখে কম্পজিশনটি কারেকশন করতে বলেন; নবী মোহাম্মদ সাঃ এর নির্দেশিতো কম্পোজিশনে তাঁর সিল মোহর তৈরী হলো। ক্যালিগ্রাফি শিল্পের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক বিষয়। আধ্যাত্মিকতার নিগুঢ় রহস্য এখানেও লুকিয়ে রয়েছে। কারণ ক্যালিগ্রাফি কম্পোজিশন এবং ক্যালিগ্রাফি শুরুর পদক্ষেপে রাসূল সাঃ এর স্পর্শ রয়েছে।
সেই মহেন্দ্রক্ষণকে ধারণ করে পৃথিবীর সকল ক্যালিগ্রাফাররা আরবি ক্যালিগ্রাফির ক্ষেত্রে ‘আল্লাহ’ শব্দটি উপর রেখে কম্পোজিশন করে থাকেন।

আধুনিক ক্যালিগ্রাফিতে তিনটি ধারা বিদ্যমান। এক, ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফি বা স্ক্রিপ্ট নির্ভর ক্যালিগ্রাফি। দুই, ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং। তিন, ভাস্কর্য বা ম্যুরাল ক্যালিগ্রাফি।
ট্রেডিশনাল বা স্ক্রিপ্ট ভিত্তিক ক্যালিগ্রাফি পবিত্র কুরআনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। মৌলিকভাবে ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফি বিভিন্ন শৈলী নির্ভর। খেলাফত আমল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুলতানি আমলের রাজা-বাদশারা খ্যাতিমান ক্যালিগ্রাফার দিয়ে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পবিত্র কুরআন লিখাতেন। রাজা-বাদশাদের মধ্যে অনেকেই ক্যালিগ্রাফার ছিলেন এবং তাঁরা নিজ হাতে কুরআন লিখতেন। ক্যালিগ্রাফার হয়ে নিজ হাতে কোরআন লিখা আভিজাত্য এবং গৌরবের প্রতীক ছিলো।

লেটার প্রেস তৈরির পূর্ব পর্যন্ত ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরা প্রকৃতি থেকে বিভিন্ন রঙের কালি তৈরি করে পবিত্র কুরআন লিখতেন। লতা-পাতা, ফল-ফুলের অপূর্ব সমন্বয়ে পবিত্র কুরআনকে তাঁরা অলংকরণ করতেন। এভাবেই ক্যালিগ্রাফি শিল্পের উৎকর্ষ সাধিত হয়।
বর্তমানে পৃথিবীর সকল মৌলিক ভাষাতেই ক্যালিগ্রাফির চর্চা হচ্ছে। বিভিন্ন রূপে, নান্দনিক ফন্টে ক্যালিগ্রাফি বিকশিত হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে আরব বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যালিগ্রাফি ফ্যাকাল্টি রয়েছে। ট্রেডিশনাল টেক্স নির্ভর ক্যালিগ্রাফির জন্য ইরান এবং তুরস্ককে আলাদা ক্রেডিট দিতে হয়, খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা থেকে ক্যালিগ্রাফির (হিস্ট্রি) উপর পিএইচ ডি করার সুযোগ রয়েছে।

ক্যালিগ্রাফির দ্বিতীয় ধারা হচ্ছে, ক্যালিগ্রাফি পেন্টিং। যা আধুনিক ক্যালিগ্রাফির নতুন রূপ। পশ্চিমা দুনিয়ার অধিকাংশ পেইন্টিং মানুষের জৈবিক তথা যৌনো চাহিদা কে উসকে দেয়। নারীর সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলাই তাঁদের কাছে শিল্প। কিন্তু সে শিল্প দর্শনে আনন্দ ও রস আস্বাদন হলেও নৈতিকতাবোধ এবং আধ্যাত্মিকতা থাকেনা। তাঁদের বেশিরভাগ শিল্প সমাজ ও রাষ্ট্রকে বেহায়াপনা এবং অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করে। ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং তার সম্পূর্ণ বিপরীত। পাশ্চাত্যের অ্যাবস্ট্রাক্ট তথা বিমূর্ত পেইন্টিং এবং প্রাচ্যকলার ওয়াশ পেইন্টিং অবলম্বনে বিভিন্ন শৈলীতে বর্ণের নান্দনিক প্রয়োগই হচ্ছে ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং। আনন্দ ও রস আস্বাদনে ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং-এ রয়েছে আধ্যাত্মিক আনন্দ ও পবিত্র সুখানুভূতি।

ক্যালিগ্রাফির তৃতীয় ধারা হচ্ছে, ভাস্কর্য বা ম্যুরাল ক্যালিগ্রাফি। এ ধারা অত্যন্ত প্রাচীন। বিভিন্ন প্রত্ন তথ্য নিদর্শন ও উদ্ধারকৃত শিলালিপিতে ক্যালিগ্রাফির অস্তিত্ব চোখে পড়ে। খেলাফত আমল থেকে শুরু করে অদ্যবধি মুসলিম স্থাপত্য শিল্পে এ ধারা অত্যন্ত প্রবল। মসজিদ, মেহরাব, গুম্বুজ, মসজিদের অভ্যন্তরের সাজসজ্জা, প্রসাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে লতা-পাতা-ফুল এবং জ্যামিতিক নকশা সমন্বিত ট্যাক্স নির্ভর ক্যালিগ্রাফির প্রয়োগ অসাধারণ। প্রাচীনকালের এ শিল্প দর্শনে শিল্পবুদ্ধা সহ সর্বসাধারণের হৃদয়-মনকে আধ্যাত্মিকতার স্পর্শে উজ্জীবিত করে। এখানে উল্লেখ্য যে, উমাইয়া শাসন আমল, আব্বাসীয় খেলাফত আমল সহ বিভিন্ন রাজন্যবর্গের স্থাপত্য শিল্পে টেরাকোটা পদ্ধতির ম্যুরাল ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি বিভিন্ন মূর্তি, দেয়াল জুড়ে জীব-জন্তু, পশুপাখি অথবা স্নানরত নারী চিত্র ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়, তা ইসলামী শিল্প নয়, মুসলিম শিল্প। এই শিল্প সমূহকে কোনভাবেই ইসলামী শিল্প বলা যায় না। এসব শিল্প তথাকথিত খলিফা এবং রাজন্যবর্গের বিলাসিতা ও দৃষ্টিভঙ্গের স্খলন। বেশিরভাগ শিল্প-বুদ্ধারা ইসলামী শিল্প এবং মুসলিম শিল্পের ডেফিনেশন বুঝতে ভুল করেন। জীবজন্তু, পশু-পাখি, নারী-পুরুষের চিত্র, মূর্তি তৈরি ইত্যাদি ইসলামে নিষিদ্ধ। ‘যে ঘরে ছবি থাকে সে ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।’
-(সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নাম্বারঃ ৫৫৩৫)
রাসূলে কারিম সা. বলেছেন- ‘প্রত্যেক (প্রাণীর) চিত্র অংকনকারীই জাহান্নামী’
-(সহীহ মুসলিম, হাদিস নাম্বারঃ ২১১০)
রাসূল সা. হযরত আলী রাঃ কে নির্দেশ দিয়েছিলেন- ‘তুমি কোন প্রাণীর ছবি দেখলেই তা বিলুপ্ত না করে ছাড়বে না। আর কোন উচু কবরকে মাটির সমান না করে থামবে না।’-(নাসায়ী, হাদিস নাম্বারঃ ২০৩১)
অন্য হাদিসে রয়েছে ‘সকল মূর্তিকে বিলুপ্ত এবং উচু কবরকে ভেঙ্গে দিবে।’-(সহীহ মুসলিম, হাদিস নাম্বারঃ ২১১৫)
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তারপরেও কিছু তথাকথিত মুসলিম খলিফা, রাজন্যবর্গ, মুসলিম নামধারী ব্যক্তি বিশেষ দ্বারা প্রাণীর চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্যের নামে মূর্তি তৈরি হয়। এর সকল কিছুই তাঁদের নেফাকি, অজ্ঞতা, উদাসীনতা এবং বিলাসী জীবন-যাপনের নৈতিক স্খলন। নেফাক তথা এই দ্বিমুখী জীবন-যাপন পরিহার করে প্রাকটিক্যাল মুসলিম হওয়ার জন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে কাফিরদরকে নয় বরং প্রতিটি ঈমানদারকে নির্দেশ করে বলেন,-‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’-
(৩ সূরা আল-ইমরানঃ ১০২)
অতএব মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলেই মুসলমান হওয়া যায় না, মুসলমান হতে হলে প্র্যাকটিক্যাল মুসলিম হতে হয়। একজন ঈমানদার ব্যক্তিকে প্রকৃত মুসলিম হতে হলে, ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এমনকি রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে ইসলামকে ফলো করতে হয়। তা না হলে বিশ্বাসের দিক থেকে আপনি ঈমানদার বটে! তবে মুসলিম নন।

শিল্প ছাড়া মানুষের জীবন অসম্পূর্ণ। বিভিন্ন ক্ষুধার মতো শিল্পক্ষুধাও সহজাত। সৌন্দর্যের রস আস্বাদনে সক্রিয়। মানুষ মাত্রই তাঁর শুবার ঘর, থাকার জায়গা, বাড়ি, সবকিছু সুন্দর করে সাজাতে চায়। রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে, স্থাপনা সাজাতে শিল্পকলার দ্বারস্থ হয়। আধুনিক রাষ্ট্রে ম্যুরাল বা ভাস্কর্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআনে ভাস্কর্য তৈরির বর্ণনা রয়েছে। হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম জ্বিনদের দিয়ে ‘তামাসিল’ অর্থাৎ প্রাণহীন বস্তুর ভাস্কর্য নির্মাণ করাতেন। -(৩৪ সূরা সাবাঃ ১৩)
তামাসিল তথা ভাস্কর্য সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। এক, জড়বস্তুর ভাস্কর্য। যেমন ফুলের ম্যুরাল বা মিনারের ভাস্কর্য। এগুলো নির্মাণ করা বৈধ। হযরত সোলায়মান আলাইহিস সালাম এই ধরনের ভাস্কর্য দিয়ে তাঁর রাষ্ট্রকে সাজিয়ে ছিলেন। দুই, প্রাণী আকৃতির ভাস্কর্য বা মূর্তি। যেগুলো পূজা বা উপাসনা করার জন্য তৈরি করা হয়। সেগুলোকে সাধারণত প্রতিমা বলা হয়। এ ধরনের ভাস্কর্য বা মূর্তি তৈরি করা মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ, হারাম। তিন, ম্যুরাল বা ভাস্কর্য। যা উপাসনা করার জন্য বানানো হয়নি। তবে প্রাণী আকৃতির। যেমন কোন মহান ব্যক্তির ভাস্কর্য যা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন বা তাঁকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বানানো হয়। এ ধরনের ভাস্কর্য নির্মাণ নিষিদ্ধ। ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।

ভাস্কর্য মূলতঃ বিগ প্রজেক্ট। দেশ সাজানোর জন্য ভাস্কর্য নির্মাণে রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হতে হয়। পবিত্র কুরআন সেদিকেই মানুষকে ইশারা করে। আরব বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় প্রাণহীন বস্তুর অসাধারণ ভাস্কর্য দেখতে পাবেন। কাতার বিশ্বকাপে ক্যালিগ্রাফি নির্ভর ভাস্কর্য পৃথিবীর শিল্পপ্রেমী মানুষদের বিমোহিত করেছে। বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাস্কর্য বা ম্যুরাল ক্যালিগ্রাফি চোখে পড়ে। শিরকি ভাস্কর্যের রিপ্লেসমেন্ট হিসাবে ক্যালিগ্রাফি নির্ভর ভাস্কর্য বা ম্যুরাল তৈরি এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্থাৎ ৩৬ জুলাই তথা ৫ই আগস্ট বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশকে দেখুন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি স্থাপনা এবং দেয়াল জুড়ে নতুন এক শিল্পচর্চার আবহ, যা পৃথিবীর মানুষকে বিস্মিত করেছে। টিনএইজ ও জেএনজি (GNZ) জেনারেশন রঙ-তুলির আঁচড়ে তাদের অনুভূতি এবং চাওয়াকে এক বিন্দুতে নিয়ে এসেছে। শিরক-কে প্রমোট করা মূর্তিগুলোর বেশিরভাগ তাঁরা ভেঙ্গে ফেলেছে। বিপ্লব সাধিত না হয়ে ন্যাচারালি ক্ষমতার পালাবদল হলে সে মূর্তিগুলো কি ভাঙ্গা যেতো? ইসলামী দলসমূহ ক্ষমতায় আসলেও এই মূর্তিগুলো ভাঙ্গা ছিলো অসম্ভব।
দেয়ালজুড়ে ক্যালিগ্রাফি এবং গ্রাফিতি চর্চা বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, নোবেল লরিয়েট ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসও বিশ্বমঞ্চে তা উপস্থাপন করেছেন। তামাম দুনিয়ার গণতন্ত্রকামী ও শান্তিপ্রিয় মানুষকে তিনি আহবান করেছেন এই ওয়াল পেইন্টিং দেখার জন্য। শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর বিভিন্ন বিপ্লবেও ওয়াল রাইটিং, দেয়াল পেইন্টিং এর ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে আরব বসন্তে ক্যালিগ্রাফি এবং গ্রাফিতির ভূমিকা ছিলো অনন্য।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি, আরবি ক্যালিগ্রাফিকে ‘আর্ট অফ হেভেন’ তথা স্বর্গীয় শিল্প বা আধ্যাত্মিক শিল্প বলা হয়। আরবি প্রতি মানুষের টান সহজাত, ঐশ্বরিক। কারণ আল্লার ভাষা আরবি, কুরআনের ভাষাও আরবি, আবার জান্নাতের ভাষাও হবে আরবি। হযরত আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতে ছিলেন বিধায় সৃষ্টিগতভাবে আরবি ভাষার সাথে প্রতিটি মানুষের সম্পর্ক জেনেটিক। আরবি ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি নিজস্ব মাতৃভাষায়ও ক্যালিগ্রাফি চর্চা হওয়া জরুরি। মহান আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীতে যত রাসূল পাঠিয়েছেন, প্রত্যেকে তাঁর নিজের স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন।-(১৪ সূরা ইব্রাহিমঃ৪)
সুতরাং বাংলাদেশী শিল্পীদের বাংলা ক্যালিগ্রাফির প্রতিও মনোযোগী হতে হবে। ডিজিটাল ভার্সনে বাংলা টাইপোগ্রাফির ব্যাপক চর্চা হলেও ক্যানভাসে বাংলা ক্যালিগ্রাফির চর্চা নিতান্ত কম। নিজস্ব শৈলী তৈরি এবং এরাবিক বিভিন্ন শৈলীতে উপকরণের বহুমাত্রিক ব্যবহার একান্ত জরুরী। ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং বিশেষ করে ম্যুরাল ক্যালিগ্রাফি তথা ভাস্কর্য ভিত্তিক হস্তশিল্পের বিশাল আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। বাংলাদেশী শিল্পীদের সে বাজারে প্রবেশ করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও বৃহত বাজার তৈরি করা প্রয়োজন। আবহমান কাল থেকে মসজিদের মিনার, গম্বুজ, মিম্বর ইত্যাদি অলংকরণে ক্যালিগ্রাফির ভূমিকা অনবদ্য। ইদানিং মার্বেল, গ্রেনাইড, টাইলসের উপর ডিজিটাল প্রিন্ট কিংবা থ্রিডি প্রিন্ট ক্যালিগ্রাফিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
শুধুমাত্র মসজিদ অলংকারণে ক্যালিগ্রাফিকে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বব্যাপী ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার অপরিহার্য। ইন্টেরিয়র ডিজাইনের সাথে সম্পর্কিত রেখে নিজেদের বেডরুম, ড্রয়িং রুম, অফিস, বাসা-বাড়ি, শপিং মল, থ্রিস্টার-ফাইভস্টার হোটেল ইত্যাদি সাজাতে ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং এর ভূমিকা অতুলনীয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। সেই মহান সংসদের অভ্যন্তরে স্পিকারের মাথার উপর যে ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে, তা ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ সম্বলিত ক্যালিগ্রাফি। ইন্টে রিয়র ডিজাইনের সাথে সম্পর্কিত রেখে উক্ত ক্যালিগ্রাফি অনন্য, অসাধারণ। সৌন্দর্যের তিয়াস মেটাতে এমন বাংলাদেশীই কাম্য ।

পঁচানব্বই পার্সেন্ট মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি তাহজিব-তামাদ্দুন, শিল্পচর্চা হতে হবে ইসলাম ভিত্তিক। কাতার রাষ্ট্র যেভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ইসলামের সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেও সেভাবে উদ্যোগী হতে হবে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিশেষ করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মূর্তির পরিবর্তে ক্যালিগ্রাফি নির্ভর ভাস্কর্য বা ম্যুরাল স্থাপন, সর্বোপরি শুদ্ধ সংস্কৃতিকে ধারণ করে বিশ্ব দরবারে আবারও বাংলাদেশকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসাবে তুলে ধরতে হবে।

মানুষ মাত্রই সৌন্দর্য পিয়াসী। আমাদের নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,-‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।’ -(সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বরঃ ৯১)
মূলতঃ সৌন্দর্যের এ পিয়াস মেটাতেই পৃথিবীতে শিল্পকলার জন্ম। ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে ইসলামী শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশে ক্যালিগ্রাফির ব্যাপক চর্চা হলেও মৌলিক অর্থে ক্যালিগ্রাফি শেখার একাডেমিক কোন প্রাতিষ্ঠান নেই। ব্যক্তিগত ভাবে অনেকেই ক্যালিগ্রাফি শেখান। কোচিং সেন্টারের মতো গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বিশাল জনসংখ্যার বিপরীতে এই প্রচেষ্টা খুবই ক্ষুদ্র, অতি নগণ্য। ক্যালিগ্রাফি শিল্পের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং ব্যবস্থাপনা সময়ের দাবি। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে ক্যালিগ্রাফির অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টফ্যাকালটিতে ক্যালিগ্রাফিকে আলাদা সাবজেক্ট হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সেক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে পারে। তাঁদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সহজ। তাছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে স্থায়ী গ্যালারি নির্মাণ, শিল্পকর্ম সংরক্ষণ, প্রদর্শন এবং পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত আবশ্যক। সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশ সেদিকে এগিয়ে যাবে, ইনশা-আল্লাহ।
Let the glorious beauty and purity of calligraphy change every home, every office.
লেখকঃ মুফাচ্ছির আহমদ ফয়েজী, সেক্রটারি, বাংলাদেশ চারুশিল্পী পরিষদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top